২০০৮ সালের পর বিশ্ববাজারে স্বর্ণের সবচেয়ে বড় দরপতন

আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামে বড় ধরনের ধস নেমেছে। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক মন্দার পর ১৮ বছরের মধ্যে এক মাসে স্বর্ণের দাম এতটা আর কখনো কমেনি।

গত মার্চে বিশ্ববাজারে এ মূল্যবান ধাতুর দাম ১১ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। বছরের শুরুতে স্বর্ণের দাম বাড়ার যে রেকর্ড তৈরি হয়েছিল, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে তা বড় পতনের মুখে পড়ল। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও মার্কিন ডলারের শক্তিশালী অবস্থানের কারণেই এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। খবর আনাদোলু এজেন্সি।

২০২৬ সালের শুরুটা স্বর্ণের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক ছিল। জানুয়ারিতে এ ধাতুর দাম ১২ দশমিক ৪২ শতাংশ বেড়েছিল, যা ছিল ১৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃদ্ধির রেকর্ড। এ ঊর্ধ্বমুখী ধারা ফেব্রুয়ারিতেও অব্যাহত ছিল এবং দাম বেড়েছিল ৮ দশমিক ৯ শতাংশ। এর মধ্য দিয়ে টানা সাত মাস স্বর্ণের দরবৃদ্ধির একটি বিরল রেকর্ড তৈরি হয়েছিল, যা ৫৩ বছরের ইতিহাসে দেখা যায়নি। কিন্তু মার্চের শেষ নাগাদ আউন্সপ্রতি স্বর্ণের দাম নেমে আসে ৪ হাজার ৯৯ ডলার ৫২ সেন্টে, যা ২০২৫ সালের নভেম্বরের পর সর্বনিম্ন।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ দরপতনের পেছনে বেশকিছু জটিল কারণ কাজ করছে। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে, যা নতুন করে মূল্যস্ফীতির শঙ্কা তৈরি করেছে। এমন অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডারেল রিজার্ভ’ সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে পারে, এমন আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। সুদহার চড়া থাকলে ডলার আরো শক্তিশালী হয়, ফলে অন্যান্য মুদ্রার বিপরীতে স্বর্ণ কেনা অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। বিনিয়োগকারীরা এখন স্বর্ণের বদলে ডলার ও বন্ডের দিকে ঝুঁকছেন।

স্যাক্সো ক্যাপিটালের ওলে হ্যানসেনের মতে, বর্তমান সংকট ভিন্ন। সাধারণত অর্থনৈতিক অস্থিরতায় মানুষ স্বর্ণ কিনলেও এবার বিনিয়োগকারীরা অন্য খাতের লোকসান মেটাতে স্বর্ণ বিক্রি করছেন। একে ‘ডিলিভারেজিং’ বলা হয়। ফলে সরবরাহ বাড়ায় দাম কমছে এবং স্বর্ণ এখন নিরাপদ সম্পদের বদলে নগদ অর্থ সংগ্রহের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।

স্বর্ণের পাশাপাশি রুপার বাজারেও বড় পতন লক্ষ করা গেছে। মার্চে রুপার দাম ১৯ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে। ফেব্রুয়ারিতে প্রতি আউন্স রুপার দাম ১২১ ডলার ৭ সেন্ট থাকলেও মার্চ শেষে তা ৭৫ ডলার ১ সেন্টে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের মজুদ থেকে স্বর্ণ বিক্রি শুরু করায় বাজারে সরবরাহ বেড়েছে, যা দামের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

সার্বিকভাবে বলা যায়, স্বর্ণের বাজার এখন এক চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, স্বর্ণ এখন কেবল নিরাপদ সম্পদ নয়, বরং নগদ অর্থ সংগ্রহের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। এপ্রিলে দাম স্থিতিশীল হবে কিনা তা এখন সম্পূর্ণভাবে বৈশ্বিক ভূরাজনীতি ও ডলারের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে।

আরও